
ইনফোপণ্ডিত ডেস্ক: মোবাইল ফোন হারিয়ে যাওয়া, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদ, চেকবই বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র হারানো, কাউকে হুমকি দেওয়া, প্রতারণার শিকার হওয়া কিংবা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করার জন্য সাধারণত জেনারেল ডায়েরি (General Diary-GD) করা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে জিডি করার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। এখন চাইলে থানায় গিয়ে সরাসরি জিডি করা যায়, আবার অনেক ক্ষেত্রে ঘরে বসেই অনলাইনে জিডি করার সুযোগ রয়েছে।
অনেকেই জানতে চান— জিডি কীভাবে করতে হয়, জিডি করতে কী কী লাগে, অনলাইনে জিডি করার নিয়ম কী এবং জিডি করতে কোনো টাকা লাগে কি না। এই প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর তুলে ধরা হলো।
জিডি কী?
জেনারেল ডায়েরি বা জিডি হলো থানার একটি সাধারণ নথিভুক্তি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি কোনো ঘটনা সম্পর্কে পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন। এটি সরাসরি মামলা নয়, তবে ভবিষ্যতে আইনি প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
জিডির মাধ্যমে পুলিশ একটি ঘটনার বিষয়ে অবগত হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যদি অভিযোগের বিষয়টি মামলার উপযোগী হয়, তাহলে পুলিশ পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিতে পারে।
কোন কোন বিষয়ে জিডি করা যায়?
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ঘটনায় জিডি করা যায়। সাধারণত নিচের বিষয়গুলোতে মানুষ সবচেয়ে বেশি জিডি করে থাকে— মোবাইল ফোন হারিয়ে গেলে, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) হারালে, পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে, শিক্ষাগত সনদ বা সার্টিফিকেট হারিয়ে গেলে, ব্যাংকের চেকবই হারিয়ে গেলে, ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে গেলে, হুমকি বা ভয়ভীতির শিকার হলে, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চুরি হলে, কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলে কিংবা প্রতারণা বা সন্দেহজনক ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করার প্রয়োজন হলে।
বর্তমানে হারানো ও প্রাপ্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনলাইনে জিডি করা সম্ভব।
জিডি করতে কী কী লাগে?
জিডি করার জন্য কী কী লাগবে, তা নির্ভর করে ঘটনার ধরনের ওপর। তবে সাধারণভাবে যে তথ্যগুলো প্রয়োজন হয়— আবেদনকারীর নাম ও ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, সচল মোবাইল নম্বর, ঘটনার তারিখ ও সময়, ঘটনার স্থান, হারানো বস্তু বা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের কপি এবং অনলাইন জিডির ক্ষেত্রে লাইভ ছবি।
বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন জিডি পোর্টাল অনুযায়ী, নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, সচল মোবাইল নম্বর এবং আবেদনকারীর লাইভ ছবি প্রয়োজন হয়।
অনলাইনে জিডি করার নিয়ম
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন জিডি সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই জিডি করা যায়।
অনলাইন জিডি পোর্টাল: https://gd.police.gov.bd
প্রথমে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, বর্তমান ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং লাইভ ছবি প্রদান করতে হবে। এরপর মোবাইলে প্রেরিত ওটিপি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করতে হবে।
লগইন করার পর জিডির ধরন নির্বাচন করতে হবে। এরপর কোন থানায় জিডি করতে চান, ঘটনার সময় ও স্থান উল্লেখ করতে হবে। পরবর্তী ধাপে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ লিখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট থাকলে তা সংযুক্ত করতে হবে। সবশেষে আবেদন সাবমিট করতে হবে।
থানায় গিয়ে জিডি করার নিয়ম
যারা অনলাইনে আবেদন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তারা সরাসরি সংশ্লিষ্ট থানায় গিয়ে জিডি করতে পারেন।
সেক্ষেত্রে থানার ডিউটি অফিসারকে ঘটনাটি বিস্তারিত জানাতে হবে। প্রয়োজনে একটি লিখিত আবেদন দিতে হতে পারে। আবেদনপত্রে আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা, ঘটনার বিবরণ এবং ঘটনার সম্ভাব্য তারিখ ও সময় উল্লেখ করতে হয়।
পুলিশ তথ্য যাচাই করে জিডি নম্বর প্রদান করবে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে বলে জিডির কপি সংরক্ষণ করা উচিত।
জিডি করতে কি টাকা লাগে?
জিডি করা সম্পূর্ণ বিনামূল্যের সেবা। অনলাইন বা সরাসরি থানায় গিয়ে জিডি করতে কোনো ধরনের সরকারি ফি দিতে হয় না।
যদি কেউ জিডি করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন, তাহলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো যেতে পারে।
অনলাইনে জিডির স্ট্যাটাস কীভাবে দেখবেন?
অনলাইন জিডি আবেদন করার পর আবেদনকারী নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করে জিডির সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারেন। অভিযোগটি জিডি হিসেবে গ্রহণ করা হলে জিডি নম্বর এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার তথ্যও দেখা যায়। এছাড়া ডিজিটাল জিডির কপি ডাউনলোড করার সুযোগ রয়েছে।
জিডি এবং মামলার মধ্যে পার্থক্য কী?
অনেকেই জিডি ও মামলাকে একই বিষয় মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
জিডি মূলত কোনো ঘটনা সম্পর্কে পুলিশকে অবহিত করার একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে মামলা হয় তখন, যখন কোনো আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং আইনি বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন জিডি পোর্টাল অনুযায়ী, অভিযোগটি যদি মামলার যোগ্য হয়, তাহলে আবেদনকারীকে অভিযোগের কপি বা কোড নম্বরসহ থানায় উপস্থিত হতে বলা হতে পারে।
জিডি করার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
জিডি করার সময় সব তথ্য সঠিকভাবে প্রদান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হারানো জিনিসের নম্বর, সিরিয়াল নম্বর বা পরিচিতিমূলক তথ্য থাকলে তা উল্লেখ করা উচিত। যেমন, মোবাইল ফোন হারালে IMEI নম্বর উল্লেখ করলে সেটি শনাক্ত করা সহজ হয়।
এছাড়া মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিয়ে জিডি করলে আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
জিডি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রক্রিয়া, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝামেলা এড়াতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন বা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র হারিয়ে গেলে দ্রুত জিডি করা উচিত। বর্তমানে অনলাইন ব্যবস্থার কারণে ঘরে বসেই সহজে জিডি করা সম্ভব হচ্ছে, যা নাগরিক সেবাকে আরও সহজ ও দ্রুত করেছে।
কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হলে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত জিডি করুন এবং জিডির কপি সংরক্ষণ করুন। এটি ভবিষ্যতে নতুন নথি উত্তোলন, বীমা দাবি বা আইনগত প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
Leave a Reply